সুবীর মণ্ডল, জেলা প্রতিনিধি, বাঁকুড়া, ভারত :
লালমাটির দেশ বাঁকুড়া। লোকশিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থানও হলো বাঁকুড়া। খাতড়া মহকুমা শহর ও বাঁকুড়া জেলা শহর থেকে সামান্য দূরে শঙ্খশিল্পের আঁতুড়ঘর ইন্দপুর ব্লকের হাটগ্রাম।বহু আন্তর্জাতিক মানের শঙ্খশিল্পীর বাস।সৃজনশীলতায় নজির সৃষ্টি করে চলেছেন বহু শঙ্খশিল্পী।এদের অন্যতম বাবলু নন্দী। ইতিমধ্যে নারকেল মালা, পাথর, টেরাকোটা, ডোকরা শিল্প-সহ একাধিক কুটিরশিল্পে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার অর্জন করেছে বাঁকুড়া। এবার আরো একটি নতুন পালক যুক্ত হলো বাঁকুড়াতে৷ শঙ্খশিল্পে এবার বাঁকুড়ার মাটিতে এলো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। যার নেপথ্যে রয়েছেন বাঁকুড়ার শঙ্খশিল্পী বাবলু নন্দী। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন স্থানে খুশির হাওয়া বইছে। জেলার মানুষ অত্যন্ত খুশি।
একটি শঙ্খের ওপর আকর্ষণীয় কারুকার্য তৈরি করেছেন বাবলু বাবু। এই অসাধারণ শিল্প কর্মের জন্য তিনি ছিনিয়ে নিয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। তাঁর হাত ধরেই জাতীয় স্তরে পৌঁছে গেল বাঁকুড়ার গর্ব শঙ্খশিল্পের নাম। তিনি ইন্দপুর ব্লকের হাটগ্রামের উত্তর পাড়ার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি যুক্ত আছেন শঙ্খশিল্পের সঙ্গে। শাঁখার ওপর নকশা বানানোতে তিনি সিদ্ধধহস্ত। তাঁর নকশার অভিনবত্ব ও শৈলী সম্পূর্ণ আলাদা। স্বতন্ত্র ভাবনায় প্রতিটি নকশা শাঁখের ওপর তুলে ধরেন তিনি। তিনি ১১ ইঞ্চির একটি শাঁখের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ করেছেন। যে কারুকাজ চমকে দেওয়ার মতো৷ শাঁখের গায়ে মহাভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন৷ শাঁখের ওপর যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। যেখানে দেখানো হয়েছে কৃষ্ণ-অর্জুনের রথযাত্রা, কর্ণের রথের চাকার মেদিনীগ্রাস, কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন, অশ্বত্থামা বধ, ভীম-দুর্যোধনের গদাযুদ্ধের দৃশ্য।
দীর্ঘ সময়ে পর পুনরায় বাঁকুড়ার কুটিরশিল্প রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এনে দেওয়ায় খুশি বাঁকুড়া জেলার শিল্পীমহল ও জেলাবাসী ।কলকাতা, মুম্বই-সহ দেশের একাধিক শহরে কুটিরশিল্প মেলায় যোগ দেওয়ায় তৈরি হয়েছে তাঁর কাজের নিজস্ব বাজার। সরকারি বিভিন্ন বিপণন সংস্থারও বরাতও পেতে থাকেন তিনি। প্রায় দেড় বছর অপেক্ষার পর সোমবার রাষ্ট্রীয় বস্ত্র মন্ত্রকের তরফে বাবলু নন্দী জানতে পারেন তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত।
এই গ্রামের শিল্পীরা আগে মূলত শাঁখা ও শঙ্খ তৈরি করতেন। কিন্তু, এখন সেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। শিল্পীরা ঘর সাজানোর নানা ধরনের শো-পিস বানাচ্ছেন। যা জেলা ছাড়িয়ে অন্যত্রও বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও কয়েকজন শিল্পী রামায়ণ, মহাভারতের নানা কাহিনি শঙ্খশিল্পের মধ্যে ফুটিয়ে তুলছেন। তামিলনাড়ু থেকে এই শিল্পের কাঁচামাল আসে। মহাজনের মাধ্যমে কলকাতা, খড়্গপুর থেকে তাঁরা সেই কাঁচামাল আনেন। করোনা পরিস্থিতির জেরে শিল্পের বিপণনে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে দাবি শিল্পীদের।
২০১৮ সালে বাবলুবাবু একটি ১১ইঞ্চি শঙ্খের উপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নানা মুহূর্ত খোদাই করে তুলে ধরেন। সেই কাজ করতে প্রায় তিনমাস সময় লাগে। ওই বছরই বাবলুবাবু তা কলকাতায় প্রতিযোগিতায় পাঠান। সেখান থেকে তা কেন্দ্রে যায়। বাবলুবাবু বলেন, “ওই শঙ্খে কৃষ্ণ, অর্জুন একসঙ্গে রথে চড়ে যুদ্ধ করছেন, এমন দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দর্শন করাচ্ছেন ও কর্ণ বধের দৃশ্যও শঙ্খে খোদাই করেছি। এছাড়া শঙ্খর বাকি অংশে যুদ্ধচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ৩২ বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে রয়েছি। এখানে বংশ পরম্পরায় শিল্পীরা শঙ্খর কাজ করেন। এর আগে রাজ্যস্তরে একাধিক পুরস্কার পেয়েছি। এবার জাতীয় স্তরের পুরস্কার পাওয়ার খবর শুনে আনন্দ হচ্ছে। তবে করোনা আবহে কেন্দ্রীয় সরকার যাতে গ্রামের অন্য শিল্পীদের পাশে দাঁড়ায়, তাঁর আবেদন করব।”
কেন্দ্রের অধীন বর্ধমান হস্তশিল্প সেবা কেন্দ্রের সহায়ক নির্দেশক মৌসুমি গুহ বলেন, করোনা পরিস্থিতির জন্য ২০১৮ সালের পুরস্কার দিতে দেরি হচ্ছে। আপাতত মন্ত্রকের তরফে বাঁকুড়ার বাবলুবাবুর পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি আমাদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। আমরা শিল্পীকে ফোনে বিষয়টি জানিয়েছি। আশা করছি, এবছরের মধ্যেই তিনি সেই পুরস্কার পাবেন। ইন্দপুর ব্লকের শুভেন্দু তন্তুবায় জানালেন, “আমরা ইন্দপুরবাসী হিসাবে খুুব গর্বিত।আরো বাবলু নন্দীর মতো শিল্পির জন্ম হোক এই জেলায়”।